গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ভালো ফলনের জন্য মোট ১৬টি খাদ্য উপাদান প্রয়োজন। এর মধ্যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গাছ বাতাস ও জল থেকে নিজেই সংগ্রহ করে নেয়। বাকি ১৩টি উপাদান, যেমন নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, লৌহ, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, বোরণ, ক্লোরিন, মলিবডিনাম ও দস্তা (জিংক), গাছ সংগ্রহ করে মাটি থেকে।
মাটিতে এই উপাদানগুলোর সঠিক পরিমাণ থাকলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। কোনো একটি উপাদানের ঘাটতি হলে গাছে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা হলো, অনেক চাষি না বুঝেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন, যাতে টাকা অপচয় হয় এবং মাটির স্বাস্থ্যও নষ্ট হয়। এই সমস্যা এড়াতে মাটি পরীক্ষা করানো জরুরি।
মাটি পরীক্ষার উদ্দেশ্য
মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে মূলত এই বিষয়গুলো জানা যায়:
- মাটির অম্লত্ব বা ক্ষারত্বের মান (pH) — মাটি অতিরিক্ত অম্লীয় বা ক্ষারীয় কিনা
- দ্রবণীয় লবণের পরিমাণ (EC) — মাটিতে লবণাক্ততা কতটা আছে
- প্রধান পুষ্টি উপাদানের মাত্রা — নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের ঘাটতি বা আধিক্য
- জৈব পদার্থের পরিমাণ — মাটির উর্বরতার সামগ্রিক অবস্থা
এই তথ্যের ভিত্তিতে ঠিক কোন সার কতটা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যায়, ফলে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও মাটির ক্ষতি দুটোই এড়ানো যায়।
কতদিন পরপর মাটি পরীক্ষা করবেন
সাধারণত ৩ থেকে ৪ বছর অন্তর মাটি পরীক্ষা করা উচিত। এই সময়ের মধ্যে ফসফেট ও পটাশের পরিমাণে সাধারণত বড় পরিবর্তন হয় না। তবে মাটির উর্বরতা বা ফলন কমে যাচ্ছে মনে হলে, নির্ধারিত সময়ের আগেও পরীক্ষা করানো ভালো।
গোবর সার, ভার্মিকম্পোস্ট বা অন্যান্য জৈব সার নিয়মিত প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকে, তাই রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
মাটি নমুনা সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতি
ধাপ ১: জমি ভাগ করে নিন
একই ধরনের গঠন, একই ফসল ও একই সার প্রয়োগের জমি হলে একটাই নমুনা যথেষ্ট। কিন্তু বিভিন্ন জমিতে বিভিন্ন ফসল বা ভিন্ন ধরনের মাটি থাকলে প্রতিটির জন্য আলাদা নমুনা সংগ্রহ করুন।
ধাপ ২: সঠিক সময় বেছে নিন
মাটির নমুনা সংগ্রহের আগে কোনো রাসায়নিক বা জৈব সার প্রয়োগ করা যাবে না। সার প্রয়োগের অন্তত কয়েক সপ্তাহ আগে বা পরে নমুনা সংগ্রহ করুন।
ধাপ ৩: মাটি খনন করুন
জমির উপরিভাগ একটু সরিয়ে V আকৃতির গর্ত করে মাটি তুলুন। একটি জমি থেকে বিভিন্ন জায়গায় (কোণা ও মাঝখান মিলিয়ে) কয়েকটি নমুনা নিয়ে সেগুলো মিশিয়ে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা তৈরি করুন।
ধাপ ৪: পরিষ্কার করে নিন
সংগ্রহ করা মাটি একটি পরিষ্কার কাগজের ওপর রেখে ঘাস, আগাছার শিকড় বা অন্য কোনো অবাঞ্ছিত অংশ বেছে বাদ দিন।
ধাপ ৫: প্যাকেট করুন
প্রায় ৫০০ গ্রাম মাটি সংগ্রহ করে পরিষ্কার প্যাকেটে ভরুন এবং জমির নাম, মালিকের নাম ও তারিখ লেখা ট্যাগ লাগিয়ে দিন।
নমুনা সংগ্রহের সময় বিশেষ সতর্কতা
- বিড়ি, সিগারেট বা তামাকজাতীয় কোনো দ্রব্য মাটিতে মেশাবেন না
- মাটি সংগ্রহের জন্য পরিষ্কার কোদাল বা খুরপি ব্যবহার করুন
- ভেজা মাটি সংগ্রহ করবেন না
- সংগ্রহের পর মাটি অতিরিক্ত রোদে শুকাবেন না
- সংগ্রহ করা মাটি বেশিদিন ফেলে না রেখে দ্রুত পরীক্ষাগারে জমা দিন
মাটি পরীক্ষা কোথায় করাবেন
নিকটবর্তী ব্লক কৃষি দপ্তর, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (KVK) অথবা রাজ্যের মৃত্তিকা পরীক্ষাগারে নমুনা জমা দিয়ে মাটি পরীক্ষা করানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই পরিষেবা বিনামূল্যে বা সামান্য খরচে সরকারিভাবে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া জানতে নিজের এলাকার কৃষি দপ্তরে যোগাযোগ করুন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট বুঝব কীভাবে?
রিপোর্টে সাধারণত pH, EC এবং নাইট্রোজেন-ফসফরাস-পটাশিয়ামের মাত্রা উল্লেখ থাকে। প্রতিটি উপাদানের পাশে "কম", "মাঝারি" বা "বেশি" নির্দেশ দেওয়া থাকে, যা দেখে সার প্রয়োগের পরিমাণ ঠিক করা যায়। রিপোর্ট বুঝতে অসুবিধা হলে কৃষি দপ্তরের কর্মীর সাহায্য নিন।
মাটি পরীক্ষা ছাড়া সার প্রয়োগ করলে কী ক্ষতি হয়?
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার প্রয়োগে টাকার অপচয় হয়, মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা কমে যায়। আবার প্রয়োজনের চেয়ে কম সার দিলে ফলনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয় না।
একটি নমুনায় কতটা জমি কভার করা যায়?
সাধারণত একই ধরনের মাটি ও একই ফসলের জমি হলে প্রায় ২-৫ একর পর্যন্ত একটি নমুনা দিয়ে কভার করা যায়। তবে জমির গঠনে ভিন্নতা থাকলে ছোট এলাকা থেকেও আলাদা নমুনা নেওয়া ভালো।
মাটি পরীক্ষা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট পরামর্শের জন্য নিকটবর্তী কৃষি দপ্তর বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
